সুপ্রিম কোর্টের এক নম্বর কোর্টে বুধবার এমন এক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল দেশ, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী—সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শুধু আইনজীবীর মাধ্যমে নয়, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই দাঁড়িয়ে পড়লেন বিচারপতিদের সামনে। এসআইআর (Special Intensive Revision) ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আমি দলের জন্য লড়তে আসিনি, ন্যায়বিচার পাচ্ছি না।” এই বক্তব্যই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় তোলে।
শুনানির শুরুতেই সিনিয়র অ্যাডভোকেট স্যাম দিবান আদালতকে জানান, আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী তার পেছনে রয়েছে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান। মাত্র চার দিন বাকি নির্বাচন কমিশনের হিয়ারিং শেষ হতে, অথচ এখনও ৬৩ লক্ষ ভোটারের শুনানি পেন্ডিং। এর পাশাপাশি ৩২ লক্ষ আনম্যাপ ভোটার এবং ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের নাম রয়েছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি তালিকায়। এই তথ্য সামনে আসতেই আদালতের ভিতরেই প্রশ্ন ওঠে—এত কম সময়ে কীভাবে প্রকৃত ভোটারদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে?
এই মামলায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী তার মধ্যে একাধিক সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনে বলা হয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতে যেসব ভোটারকে ‘আনম্যাপ’ করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই পৃথকভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা ধরে কাউকে বাদ না দিয়ে শুধুমাত্র সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ না পড়ে।
মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বানানগত ত্রুটি। প্রায় ৭০ লক্ষ নাম শুধুমাত্র বানানের অসঙ্গতির কারণে সন্দেহজনক তালিকায় চলে গেছে বলে অভিযোগ। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, যাঁদের কাছে যে সরকারি নথি রয়েছে—আধার, ডমিসাইল সার্টিফিকেট, পঞ্চায়েত বা পুরসভার দেওয়া বাসিন্দা প্রমাণপত্র—সেই নথির ভিত্তিতেই সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। নির্দিষ্ট একটি ডকুমেন্ট চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি উঠে এসেছে মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকা নিয়ে। আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী তার মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মাইক্রো অবজার্ভাররা ইআরওদের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন, যা আইনসিদ্ধ নয়। তাই তাঁদের প্রত্যাহার করতে হবে এবং কোনও রকম প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে বিরত রাখতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে না পাঠিয়ে সরকারি চ্যানেলে জারি করার দাবিও তোলা হয়েছে।
এই সব দাবির মধ্যেই সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে যখন মুখ্যমন্ত্রী নিজে পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে আদালতে বক্তব্য রাখেন। আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছি। আমাদের আইনজীবীরা লড়ছে, আমরা সুবিচারের জন্য কাঁদছি, কিন্তু কোথাও বিচার পাচ্ছি না।” তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ছয়টি চিঠি লেখা হলেও কোনও উত্তর মেলেনি।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত তখন মন্তব্য করেন, মৃত বা রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া ভোটারের নাম তালিকায় থাকুক, সেটাও কেউ চায় না—তবে প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়াও কাম্য নয়। আবেদনপত্রে কী কী দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী সেই প্রেক্ষিতেই এখন গোটা দেশের নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে। কারণ ইতিহাসে এই প্রথম কোনও কার্যরত মুখ্যমন্ত্রী নিজে মামলা করে, নিজেই সর্বোচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়াল করলেন—আর সেই সওয়াল ঘিরেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের নতুন অধ্যায়।





